পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়? ১০টি কার্যকর চিকিৎসা ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

Table of Contents

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়? ১০টি প্রধান কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত গাইড

পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, ওষুধের ব্যবহার, খাদ্যতালিকা এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিত্তথলিতে পাথর বা গলস্টোন (Gallstones) একটি পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেকের ক্ষেত্রে এই পাথর কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না। আবার কারও ক্ষেত্রে পেটের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, বমি, জ্বর, এমনকি জটিলতা দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

এই নিবন্ধে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আধুনিক চিকিৎসা, ওষুধের ভূমিকা, হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে প্রচলিত দাবি এবং কী খাবেন ও কী বর্জন করবেন—সবকিছু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

পিত্তথলি কী এবং পিত্তথলিতে পাথর কীভাবে হয়?

পিত্তথলি (Gallbladder) হলো যকৃতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলির মতো অঙ্গ। যকৃতে তৈরি পিত্তরস এই থলিতে জমা থাকে। খাবার হজমের সময় পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে এবং বিশেষ করে চর্বি হজমে সহায়তা করে।

পিত্তরসে কোলেস্টেরল, বিলিরুবিন, পিত্তলবণ এবং অন্যান্য উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হলে অথবা পিত্তথলি ঠিকমতো খালি না হলে পাথর তৈরি হতে পারে। পাথর একটিও হতে পারে, আবার একাধিক ছোট-বড় পাথরও হতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার অবস্থাকে Cholelithiasis বলা হয়। পাথর সাধারণত দুই ধরনের—কোলেস্টেরল পাথর এবং পিগমেন্ট বা বিলিরুবিনজাত পাথর। পাথরের ধরন, আকার ও অবস্থানের ওপর উপসর্গ এবং চিকিৎসা নির্ভর করে। [১]

পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ১০টি প্রধান কারণ

১. পিত্তরসে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল

পিত্তরসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে তা সম্পূর্ণভাবে দ্রবীভূত না-ও হতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে কোলেস্টেরলের স্ফটিক তৈরি হয় এবং সেগুলো জমে পাথরে পরিণত হতে পারে।

২. স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন

অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে পিত্তরসে কোলেস্টেরলের ভারসাম্যহীনতা এবং পিত্তথলির কার্যকারিতার পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৩. দ্রুত ওজন কমানো

অল্প সময়ে অতিরিক্ত ওজন কমানো, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, ক্র্যাশ ডায়েট করা অথবা কিছু ওজন কমানোর অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত ওজন হ্রাস পিত্তথলিতে পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কঠোর ডায়েট করা উচিত নয়।

৪. অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, পরিশোধিত শর্করা এবং আঁশযুক্ত খাবারের স্বল্পতা পিত্তপাথরের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও চর্বিযুক্ত খাবার কিছু রোগীর ব্যথা বাড়াতে পারে, যদিও শুধু এসব খাবার খাওয়াই পাথর তৈরির একমাত্র কারণ নয়।

৫. নারী হওয়া ও হরমোনের প্রভাব

নারীদের পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। গর্ভাবস্থা, ইস্ট্রোজেনের প্রভাব এবং কিছু হরমোনভিত্তিক ওষুধের কারণে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে।

৬. বয়স বৃদ্ধি

বয়স বাড়ার সঙ্গে পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তবে কম বয়সেও পিত্তপাথর হতে পারে।

৭. বংশগত প্রবণতা

পরিবারের নিকটাত্মীয়দের পিত্তথলিতে পাথর থাকলে অন্য সদস্যদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। জিনগত বৈশিষ্ট্যও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

৮. ডায়াবেটিস ও বিপাকীয় সমস্যা

ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা এবং বিপাকীয় সিনড্রোম পিত্তপাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৯. লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার কিছু রোগ

কিছু রক্তরোগে লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত ভেঙে যায়। এর ফলে বিলিরুবিনের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং পিগমেন্ট পাথর তৈরির ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

১০. পিত্তথলি ঠিকমতো খালি না হওয়া

পিত্তথলি নিয়মিত ও যথাযথভাবে খালি না হলে পিত্তরস জমে থাকার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এবং দ্রুত ওজন কমানোর মতো পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া কিছু অন্ত্রের রোগ, লিভারের নির্দিষ্ট সমস্যা এবং পিত্তনালির সংক্রমণও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে একজন ব্যক্তির পাথর কেন হয়েছে, তা নির্ধারণ করতে তাঁর চিকিৎসার ইতিহাস ও পরীক্ষার ফল বিবেচনা করতে হয়। [১, ২]

পিত্তথলিতে পাথরের লক্ষণ কী কী?

অনেকের পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও কোনো উপসর্গ থাকে না। একে উপসর্গহীন বা Silent Gallstones বলা হয়। অন্যদিকে পাথর পিত্তনালির মুখ আটকে দিলে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • পেটের ডান দিকের ওপরের অংশে ব্যথা।
  • পেটের মাঝখানে বা বুকের নিচের দিকে ব্যথা।
  • ব্যথা ডান কাঁধ বা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়া।
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া।
  • ভারী খাবারের পর ব্যথা শুরু হওয়া।
  • ব্যথা ৩০ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া।

তবে এসব লক্ষণ শুধু পিত্তপাথরের জন্যই হয় না। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহসহ অন্যান্য সমস্যাতেও অনুরূপ উপসর্গ হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়। [১, ৩]

পিত্তথলিতে পাথর হলে কী কী পরীক্ষা করতে হয়?

১. পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম

পিত্তথলিতে পাথর শনাক্ত করার জন্য পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম বা USG Whole Abdomen একটি প্রচলিত ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এতে পাথরের উপস্থিতি, পিত্তথলির দেয়ালের অবস্থা এবং পিত্তনালি প্রসারিত হয়েছে কি না—তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

২. রক্ত পরীক্ষা

চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী লিভার ফাংশন টেস্ট, বিলিরুবিন, সম্পূর্ণ রক্ত গণনা (CBC) এবং প্রয়োজনে অগ্ন্যাশয়ের এনজাইম পরীক্ষা দিতে পারেন। এসব পরীক্ষা সংক্রমণ, প্রদাহ বা পিত্তনালিতে বাধার সম্ভাবনা মূল্যায়নে সাহায্য করে।

৩. MRCP বা অন্যান্য পরীক্ষা

আল্ট্রাসনোগ্রামে পিত্তনালির পাথর স্পষ্ট না হলেও সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক MRCP অথবা Endoscopic Ultrasound করার পরামর্শ দিতে পারেন। সব রোগীর এসব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। [৪]

পিত্তথলিতে পাথর হলে কী চিকিৎসা করতে হবে?

চিকিৎসা নির্ভর করে পাথর উপসর্গ সৃষ্টি করছে কি না, পাথরের ধরন, পিত্তনালিতে বাধা আছে কি না এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।

১. কোনো উপসর্গ না থাকলে

আল্ট্রাসনোগ্রামে পাথর ধরা পড়লেও যদি কোনো উপসর্গ না থাকে এবং পিত্তথলি ও পিত্তনালি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসক রোগীর অবস্থা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন।

তবে পাথরজনিত ব্যথা, সংক্রমণ বা অন্য কোনো জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। [৪]

২. ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গ থাকলে

বারবার পিত্তপাথরজনিত ব্যথা হলে সাধারণত ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেক্টমি (Laparoscopic Cholecystectomy) বা ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে পিত্তথলি অপসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়।

এটি পিত্তথলির উপসর্গযুক্ত পাথরের একটি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা। পিত্তথলি অপসারণের পরও অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। যকৃত পিত্তরস তৈরি করতে থাকে, যা সরাসরি অন্ত্রে প্রবাহিত হয়। [৩, ৪]

৩. পিত্তনালিতে পাথর আটকে গেলে

পাথর যদি সাধারণ পিত্তনালিতে আটকে যায়, তাহলে ERCP (Endoscopic Retrograde Cholangiopancreatography) নামের এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে পাথর অপসারণ করা হতে পারে। এরপর রোগীর অবস্থা অনুযায়ী পিত্তথলির অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে।

পিত্তথলির পাথর গলানোর ওষুধ: কোন ওষুধ, কত দিন এবং কী মাত্রায়?

Ursodeoxycholic Acid বা Ursodiol

কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে Ursodeoxycholic Acid (UDCA), যা Ursodiol নামেও পরিচিত, ব্যবহার করা হয়। এই ওষুধ নির্দিষ্ট ধরনের কোলেস্টেরল পাথর গলাতে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি সব ধরনের পাথরে কাজ করে না।

সাধারণত ছোট, কোলেস্টেরলজাত এবং উপযুক্ত বৈশিষ্ট্যের পাথরের ক্ষেত্রে—বিশেষ করে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব না হলে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে—বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এই চিকিৎসা বিবেচনা করতে পারেন। পিগমেন্ট পাথরের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সাধারণত নেই বা অত্যন্ত সীমিত।

ওষুধের মাত্রা: রোগীর ওজন, পাথরের বৈশিষ্ট্য, লিভারের অবস্থা এবং নির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি অনুযায়ী মাত্রা ঠিক করা হয়। তাই রোগীর তথ্য ও পরীক্ষার ফল ছাড়া নির্দিষ্ট মিলিগ্রাম, দিনে কতবার, কত ফোঁটা বা কত দিন ওষুধ খেতে হবে—এমন ব্যক্তিগত প্রেসক্রিপশন দেওয়া নিরাপদ নয়।

কত দিন খেতে হয়? পাথর গলানোর চিকিৎসায় কয়েক মাস থেকে কখনো কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা করে ফলাফল মূল্যায়ন করতে হয়। চিকিৎসা সফল হলেও পরে আবার পাথর তৈরি হতে পারে। [৫, ৬]

এই ওষুধ নিজে থেকে শুরু করবেন না। একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। ব্যথা কমানোর ওষুধও রোগীর অন্যান্য রোগ, অ্যালার্জি, কিডনি ও লিভারের অবস্থা বিবেচনা করে নির্বাচন করা উচিত।

হোমিওপ্যাথি দিয়ে কি পিত্তথলির পাথর গলানো সম্ভব?

কিছু হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা রোগীর উপসর্গের উন্নতির ভিত্তিতে দাবি করেন যে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে পিত্তথলির পাথর কমেছে বা গলেছে। এ ধরনের দাবি বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেলেও তা থেকে ওষুধটির কার্যকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না।

বর্তমানে পিত্তথলির পাথর গলানোর জন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কার্যকর—এমন নির্ভরযোগ্য, উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের National Center for Complementary and Integrative Health (NCCIH) জানিয়েছে, নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা সমর্থন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অপ্রতুল। [৭]

তাই হোমিওপ্যাথি গ্রহণ করতে চাইলে সেটিকে প্রমাণিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে পিত্তথলির প্রদাহ, পিত্তনালিতে বাধা বা জন্ডিসের লক্ষণ থাকলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

কোনো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণকে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করতে হলে পাথর চিকিৎসার আগে ও পরে আল্ট্রাসনোগ্রামের ফল, পাথরের আকার, সংখ্যা, রোগীর উপসর্গ এবং অন্যান্য চিকিৎসার তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

পিত্তথলিতে পাথর হলে কী খাবেন?

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন পাথর নিশ্চিতভাবে গলিয়ে দেয় না। তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

উপকারী খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে রয়েছে:

  • শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া।
  • পরিমিত পরিমাণে সম্পূর্ণ শস্যজাত খাবার গ্রহণ।
  • মাছ, ডাল এবং উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস বেছে নেওয়া।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বি গ্রহণ।
  • নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় না খেয়ে না থাকা।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা, যদি চিকিৎসক তরল গ্রহণে কোনো সীমাবদ্ধতা না দিয়ে থাকেন।

যেসব খাবারে আপনার ব্যথা বাড়ে, সেগুলো চিহ্নিত করে কমিয়ে দিন। সবার জন্য একই খাদ্যতালিকা উপযুক্ত নয়।

পিত্তথলির পাথর
পিত্তথলির পাথর

পিত্তথলিতে পাথর হলে কোন খাবার বর্জন বা কমাতে হবে?

নিচের খাবারগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া কমানো উপকারী হতে পারে:

১. অতিরিক্ত তেলযুক্ত ভাজাপোড়া খাবার।

২. চর্বিযুক্ত মাংস এবং দৃশ্যমান অতিরিক্ত চর্বি।

৩. অতিরিক্ত মাখন, ঘি ও উচ্চমাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার।

৪. অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয় এবং পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার।

৫. অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত ফাস্ট ফুড।

৬. দ্রুত ওজন কমানোর জন্য অনাহার, ক্র্যাশ ডায়েট বা দীর্ঘ সময় উপবাসের মতো অনিরাপদ পদ্ধতি।

সব চর্বি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত নয়; বরং পরিমাণ ও ধরন সম্পর্কে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। খাবার পরিবর্তন করলে ব্যথা কমতে পারে, কিন্তু পাথর দূর হয়ে গেছে—এমন ধরে নেওয়া যাবে না। [২, ৩]

পিত্তথলিতে পাথর প্রতিরোধের উপায়

পিত্তপাথরের সব ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
  • অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে কমানো।
  • নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করা।
  • আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো এবং অতিরিক্ত চিনি কমানো।
  • দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়ানো।
  • ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করা।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দ্রুত ওজন কমানোর ওষুধ বা কঠোর ডায়েট অনুসরণ না করা।

ওজন কমানোর সময় ধীর ও ধারাবাহিক পদ্ধতি বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। [২]

পিত্তথলিতে পাথর হলে কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:

  • তীব্র পেটব্যথা কয়েক ঘণ্টা ধরে থাকা বা ক্রমশ বেড়ে যাওয়া।
  • জ্বর বা কাঁপুনি।
  • চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া।
  • প্রস্রাব অস্বাভাবিক গাঢ় হওয়া অথবা মল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।
  • বারবার বমি হওয়া বা পানি পান করতে না পারা।

এসব লক্ষণ পিত্তথলির প্রদাহ, পিত্তনালিতে বাধা, সংক্রমণ বা অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের ইঙ্গিত হতে পারে। চিকিৎসা নিতে দেরি করলে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। [১, ৩]

উপসংহার

পিত্তথলিতে পাথর হওয়ার পেছনে কোলেস্টেরলের ভারসাম্যহীনতা, স্থূলতা, দ্রুত ওজন কমানো, বংশগত প্রবণতা, হরমোনের প্রভাব এবং কিছু বিপাকীয় রোগ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রত্যেক রোগীর অবস্থা আলাদা। কারও কোনো চিকিৎসা ছাড়াই পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট হতে পারে, আবার কারও অস্ত্রোপচার বা পিত্তনালির বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে Ursodeoxycholic Acid ব্যবহার করা হলেও তা সব পাথরে কার্যকর নয়। হোমিওপ্যাথি দিয়ে পিত্তথলির পাথর গলানোর দাবিও এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই সঠিক রোগ নির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জরুরি লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতা: এই নিবন্ধটি সাধারণ শিক্ষামূলক তথ্যের জন্য তৈরি। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন বা সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স

১. National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases (NIDDK) — Symptoms & Causes of Gallstones: https://www.niddk.nih.gov/health-information/digestive-diseases/gallstones/symptoms-causes

২. NIDDK — Dieting & Gallstones: https://www.niddk.nih.gov/health-information/digestive-diseases/gallstones/dieting

৩. NHS — Gallstones: https://www.nhs.uk/conditions/gallstones/

৪. NICE — Gallstone Disease: Diagnosis and Management: https://www.nice.org.uk/guidance/cg188

৫. NIDDK — Treatment for Gallstones: https://www.niddk.nih.gov/health-information/digestive-diseases/gallstones/treatment

৬. MedlinePlus — Ursodiol: https://medlineplus.gov/druginfo/meds/a699047.html

৭. National Center for Complementary and Integrative Health (NCCIH) — Homeopathy: https://www.nccih.nih.gov/health/homeopathy

Related Posts

হার্টবিট বেড়ে যাওয়া হোমিও চিকিৎসা

হঠাৎ হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ও বুক ধড়ফড়ানি: কারণ, লক্ষণ, রোগের নাম ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ভূমিকা অনেক সময় মানুষ হঠাৎ অনুভব করেন যে তার হার্ট খুব দ্রুত ধড়ফড় করছে, বুকের ভেতর…

Read more

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনুযায়ী আমাশা রোগ

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনুযায়ী আমাশা রোগ: সংজ্ঞা, কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও চিকিৎসা ভূমিকা আমাশা (Dysentery) একটি প্রাচীন ও বহুল প্রচলিত অন্ত্রজনিত রোগ, যা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় খুবই সাধারণ। অতিরিক্ত মলত্যাগ, রক্ত-মিউকাস…

Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You Missed

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়? ১০টি কার্যকর চিকিৎসা ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • 14 views
পিত্তথলিতে পাথর কেন হয়? ১০টি কার্যকর চিকিৎসা ও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

আক্কেল দাঁত উঠলে অসহ্য ব্যথা কেন হয়? জানুন কারণ ও চিকিৎসা

  • 19 views
আক্কেল দাঁত উঠলে অসহ্য ব্যথা কেন হয়? জানুন কারণ ও চিকিৎসা

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনুযায়ী গ্যাস্ট্রিক (অম্লতা) – কারণ,

  • 22 views
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অনুযায়ী গ্যাস্ট্রিক (অম্লতা) – কারণ,

গর্ভবতী মায়েদের পায়ে ব্যথা বা বাতের ব্যথা

  • 17 views
গর্ভবতী মায়েদের পায়ে ব্যথা বা বাতের ব্যথা

হার্টবিট বেড়ে যাওয়া হোমিও চিকিৎসা

  • 17 views
হার্টবিট বেড়ে যাওয়া হোমিও চিকিৎসা

রক্ত কাকে বলে, বয়স অনুযায়ী রক্তের পরিমাণ ও রক্তের কণিকা

  • 20 views
রক্ত কাকে বলে, বয়স অনুযায়ী রক্তের পরিমাণ ও রক্তের কণিকা